শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সন্তান ধারণ করার সময় থেকে সন্তান জন্মদানের পরবর্তী সময় পর্যন্ত একজন নারীকে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় প্রতিদিন গড়ে ৩২জন নারী মারা যান। শুধু তাই নয় মৃত্যু ঘটে বহু শিশুরও। এটার অন্যতম কারন হিসেবে আমরা আমাদের জানাশোনার সীমাবদ্ধতা ও অসচেতনাকে দায়ী করতেই পারি।

যদি গর্ভাবস্থায় সন্তান একজন হবু মা কি ধরণের ঝুঁকি বা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে এ সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকে তাহলে অনেকাংশেই এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গুলো থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়া যাই। আজকের আর্টিকেল এ একজন হবু মা গর্ভাবস্থায় যেসব জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে সে সম্পর্কে জানাবো।

গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ

গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ অনেক সময় কোন মারাত্মক জটিলতারও লক্ষন হতে পারে, যেমন-একটোপিক প্রেগন্যান্সি, গর্ভপাত বা প্লাসেন্টা জনিত কোন সমস্যা ইত্যাদি। ডাক্তার রক্তপাতের কারণ জানার জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করতে পারেন, যেমন-শারীরিক পরীক্ষা, আলট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা ইত্যাদি যাতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে গর্ভবতী মা এবং গর্ভের শিশুর সবকিছু ঠিকঠাক আছে। গর্ভাবস্থায় রক্তক্ষরণ বা যোনীপথে স্পটিং হওয়া স্বাভাবিক বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে। এটি কোন সমস্যার কারণ নয় ৷ কিন্তু যেহেতু রক্তপাত হওয়া অন্য আরও জটিলতার লক্ষন ৷ তাই এটি দেখা গেলেই দেরী না করে ডাক্তারকে জানানো উচিত যাতে তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে সবকিছু ঠিক আছে কিনা?

গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতা


গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন কারণে রক্তস্বল্পতা হয়। যেমন – ১. আয়রনসমৃদ্ধ খাবার, আমিষ জাতীয় খাবার অথবা ভিটামিনের (ভিটামিন বি১২/ ফলিক অ্যাসিড) অভাব হলে। ২. গর্ভকালীন সময়ে রক্তক্ষরণ হলে। গর্ভাবস্থায় যেসব কারণে রক্তক্ষরণ হয় সেগুলো হলো – গর্ভপাত, গর্ভফুল ছিঁড়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক স্থানে থাকা। তৃতীয় বিশ্বে গুঁড়ো কৃমি আরেকটি অন্যতম কারণ। প্রতিটি কৃমি প্রতিদিন শূন্য দশমিক ২৫ মিলি লিটার পর্যন্ত রক্ত শোষণ করতে পারে। এছাড়া রক্ত আমাশয়, এনাল পাইলস থেকেও রক্তক্ষরণ হয়। গর্ভাবস্থায় এনাল পাইলস আরো তীব্র হতে পারে। ৩. রক্তকণিকা বা হিমোগ্লোবিনে বংশানুক্রমিক কোনো সমস্যা থাকলে। ৪. সংক্রমণ বা ইনফেকশনের কারণে, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা এমনকি মূত্রথলির সংক্রমণের কারণেও রোগী রক্তস্বল্পতায় ভুগতে পারে। ৫. এছাড়া গর্ভাবস্থা নিজেই রক্তস্বল্পতার একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রক্তে মূলত দুটি অংশ – তরল অংশ এবং কোষ ও কণিকা। গর্ভকালীন সময়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তরল অংশ বৃদ্ধি পায় প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ এবং লোহিত কণিকা বৃদ্ধি পায় মাত্র ২০-২৫ শতাংশ। এই অসামঞ্জস্যতা স্বাভাবিকভাবেই গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতার একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রক্তস্বল্পতার কারণে যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে-
এটি মূলত নির্ভর করে গর্ভবতীর রক্তস্বল্পতার পরিমাপের (degree of anaemia) ওপর। রক্তে হিমোগ্লোবিন ৮-১০ শতাংশ গ্রাম হলে সাধারণত কিছুটা দুর্বল লাগে। এর চেয়ে কম হলে অনেক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, হজমে অসুবিধা, বুক ধড়ফড় করা, পায়ে পানি আসা ইত্যাদি। জিহ্বা বা মুখে ঘা হতে পারে। কখনো কখনো শ্বাসকষ্ট পর্যন্ত হতে পারে।

অতিরিক্ত বমি হওয়া

গর্ভাবস্থায় হবু মায়ের বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া খুব সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্ত অতিরিক্ত বমি হওয়া মোটেও সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। বমির কারণে বা বমি ভাবের কারণে আপনি কিছু খেতে বা পান করতে পারছেন না যখন তখন আপনার ড্রিহাইড্রেশন প্রব্লেম প্রবল আকারে দেখা দেবে যার যেটা আপনার বাচ্চার জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক। তাই এই সমস্যা দেখা দিলেই আপনার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সে আপনাকে আপনার ডায়েট বদলে দেবে অথবা আপনাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবে।

শিশুর মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া


পেটের মধ্যে শিশুর নড়াচড়া শুরু হয় প্রসবের বহু আগ থেকেই। দশ সপ্তাহ বা বার সপ্তাহ থেকেই পেটের মধ্যে শিশু নড়াচড়া করতে থাকে। কিন্তু মা তখন সেটা বুঝতে পারেন না।
যিনি প্রথম বারের মতো মা হচ্ছেন তিনি এই নড়া চড়া বুঝতে পারেন তার গর্ভকালীন সময়ের ছ’মাসের পর। এর আগে তার মধ্যে একটা অনুভূতি কাজ করে। কিন্তু বাচ্চার নড়াচড়ার পরিমাণ গুনতে সক্ষম হয় না।
যার আগের গর্ভধারনের অভিজ্ঞতা আছে, যিনি আগে মা হয়েছেন, অর্থাৎ যিনি দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো মা হচ্ছেন তিনি হয়তো আরো আগে পেটে বাচ্চার নড়াচড়া বুঝতে বা গুনতে পারেন। তবে সেটাও অন্তত পাঁচমাস সময়ে।
একটা বাচ্চা পেটে নড়াচড়া করছে কী করছে না, কতবার নড়াচড়া করছে এটা মা কখন থেকে গোনা শুরু করবে? আমরা ( ডাক্তার) বলি, ২৮ সপ্তাহের পর থেকে আপনারা পেটে বাচ্চার নড়াচড়া গুনবেন।
প্রতি ১২ ঘন্টায় অর্থাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত পেটে একটি সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা দশবার নড়াচড়া করে থাকে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখি, পেটে বাচ্চা হয়তো সকালে নড়েছে। দুপুরে কিছু সময়ের জন্য বাচ্চা নড়াচড়া করেনি। তখনই অন্ত:স্বত্ত্বা ফোন করে অস্থির করে ফেলেন যে, পেটে বাচ্চা নড়াচড়া করছে না।
এতে অস্থির হওয়ার বা ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দেখতে হবে পুরো ১২ ঘন্টায় শিশুটি দশবার নড়াচড়া করলো কি-না? শিশু পরিস্থিতির উপর নড়াচড়া করে। তারাও পেটে ঘুমায়। যখন ঘুমায় তখন নড়াচড়া বন্ধ থাকে।
আমরা সাধারণত যেটা বলি মা ভারি খাওয়ার পরপর বাচ্চা ভালো নড়ে। মাকে আমরা বলি সকালে নাস্তার পর, দুপুরে খাওয়ার পর ও রাতে খাওয়ার পর আপনি ( গর্ভবতী মা) শুবেন। এ সময় বাচ্চা যে নড়াচড়াটা করে তা আপনি গুনবেন।
যদি সকালে নাস্তার পরে তিনবার, দুপুরে খাওয়ার পর তিনবার ও রাতে খাওয়ার পর তিনবার- অর্থাৎ মোট নবার যদি বাচ্চা নড়ে ও সারাদিনের চলাফেরায় অন্তত একবার নড়ে, তাহলে বুঝতে হবে পেটে বাচ্চা সুস্থ আছে। একটা লক্ষনীয় বিষয় হচ্ছে বাচ্চা যখন নড়তে থাকে তখন কিন্তু অনেকক্ষণ ধরেই নড়ে। এটাকে আপনিএকহিসেবে কাউন্ট করতে হবে। যখন থামল আবার নড়াচড়া শুরু করল তখন আবারদুইকরে গুনতে হবে। অনেকে যেটা ভুল করে, যখন বাচ্চা নড়া শুরু করে তখন গুনতে গুনতে এক থেকে একশ পর্যন্ত গুনে ফেলে। আসলে কিন্তু তা নয়। প্রতিবার থামলেইএক` গুনতে হবে। এভাবে যদি সারাদিনে সে দশবার নড়াচড়া করে তাহলে বুঝতে হবে বাচ্চা সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে।
তবে কোনো বাচ্চা যদি কোনো কারণে অস্বাভাবিক থাকে তাহলে কিন্তু সে দশবারের কম নড়ে। কোনো বাচ্চা যদি পাঁচবার বা ছয়বার নড়ে তাহলে সেটা সবার আগে মা টের পাবেন যদি তিনি সতর্ক থাকেন। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের সঙ্গে তখন যোগাযোগ করা উচিত।

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্ত চাপ মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞগণ উল্লেখ করেছেন গর্ভাবস্থায় শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ মহিলা উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হন। গর্ভকালীন প্রাথমিক অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হলে এবং যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া গেলে একদিকে মা ও সন্তানের জীবনের ঝুঁকি যেমন কমানো যায় তেমনি পরবর্তীতে কিডনি ও হৃদরোগ সমস্যা খানিকটা হলেও রোধ করা যায়।

উচ্চ রক্তচাপ আছে এমন গর্ভবতী মায়ের জন্য বিশেষ সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় প্রতিবার চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চেকআপের জন্য গেলে অবশ্যই নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করা জরুরি।

ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া, হাতে-পায়ে পানি আসা, মাথা ও ঘাড়ে ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন ও রক্তচাপ মাপুন।

খাবারে অতিরিক্ত লবণ ও পাতে কাঁচা লবণ এড়িয়ে চলুন।

গর্ভাবস্থায় সব ধরনের ওষুধ খাওয়া যায় না, তাই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

অনলাইনে ডক্টর ও টেলিমেডিসিন সেবা এখন খুব সহজ

গাইনী এ্যান্ড অব্‌স বিশেষজ্ঞ সহ যেকোন ডাক্তারের অ্যাপয়েন্ট পেতে গুগল প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করুন 

স্বাস্থ্য বিডি মোবাইল অ্যাপ  অথবা ভিজিট করুন  স্বাস্থ্য বিডি ওয়েবসাইট এবং বিস্তারিত জানতে কল করুন +8801400-040404 নম্বরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *